ক্রিকেটের অন্ধকার জগত: ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ইতিহাস এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশন

১৯৮৩ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দল যখন বিশ্বকাপ জিতেছিল, তখন থেকে শুরু করে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ধারণাই ছিল না যে একটি ক্রিকেট ম্যাচও “ফিক্স” বা পাতানো হতে পারে। ভারতে ক্রিকেটকে যেখানে ধর্মের মতো পূজা করা হয়, সেখানে এই খেলাটির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার জগতের গল্প সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। কীভাবে পানওয়ালা থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম এই ফিক্সিংয়ের জালে জড়িয়ে পড়েছিল, আসুন সেই ইতিহাস বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
প্রথম ধাক্কা: পাকিস্তান এবং সেলিম মালিক
ক্রিকেট বিশ্বে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কথা প্রথম বড় পরিসরে সামনে আসে ১৯৯৪ সালে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল তখন পাকিস্তান সফরে তিনটি টেস্ট ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল।
- সিরিজ চলাকালীন অস্ট্রেলিয়ান স্পিনার শেন ওয়ার্ন প্রকাশ করেন যে, পাকিস্তানি খেলোয়াড় সেলিম মালিক তাকে ২ লক্ষ ৭৬ হাজার মার্কিন ডলারের (প্রায় ২ কোটির বেশি টাকা) প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
- শর্ত ছিল একটাই—অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচ হারতে হবে। সেলিম মালিক ওয়ার্নকে বলেছিলেন, পাকিস্তান নিজেদের মাটিতে হারলে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।
- শেন ওয়ার্ন এবং মার্ক ওয়াহ বিষয়টি তাদের কোচকে জানান। এরপর পাকিস্তানে বিচারপতি মালিক মহম্মদ কাইউমের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়।
- তদন্ত শেষে সেলিম মালিককে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় এবং তিনি প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের দায়ে জেলে যান (যদিও ২০০৮ সালে একটি স্থানীয় আদালত তার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়)।
ভারতীয় ক্রিকেটে ফিক্সিংয়ের প্রবেশ: মনোজ প্রভাকর এবং ২৫ লাখের প্রস্তাব
পাকিস্তানের ঘটনার পর কয়েক বছর বিষয়টি ধামাচাপা থাকলেও, ১৯৯৭ সালে ফিক্সিংয়ের ভূত আবারও সামনে আসে।
‘আউটলুক’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় ক্রিকেটার মনোজ প্রভাকর জানান, ১৯৯৪ সালে শ্রীলঙ্কায় একটি সিরিজ চলাকালীন তাকে ম্যাচ হারার জন্য ২৫ লক্ষ টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিসিসিআই-এর প্রাক্তন সভাপতি আই.এস. বিন্দ্রা দাবি করেন, এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন কপিল দেব (যাঁকে ভারতের মাইকেল জর্ডান বলা হয়)।
এই অভিযোগের পর বিসিসিআই ভারতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওয়াই.ভি. চন্দ্রচূড়ের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে ‘চন্দ্রচূড় রিপোর্ট’ জমা পড়লেও, সেখানে সঠিক প্রমাণের অভাবে বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবেই চিহ্নিত হয়।
২০০০ সালের কেলেঙ্কারি: হান্সি ক্রোনিয়ে এবং সঞ্জীব চাওলা
২০০০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা দল ভারত সফরে আসে। এই সিরিজের সময়ই ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ফিক্সিং কেলেঙ্কারিটি সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে ফাঁস হয়ে যায়।
দিল্লি পুলিশ তখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁদাবাজির তদন্ত করছিল। সেলিম হতেলি নামক এক গ্যাংস্টার অ্যাপোলো টায়ার এবং খান্না জুয়েলার্সের মালিকদের কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। ব্যবসায়ীরা পুলিশের দ্বারস্থ হন। পুলিশ সেলিম হতেলির ফোন ট্যাপ করতে গিয়ে টি-সিরিজের মালিক গুলশান কুমারের ভাই কিষাণ কুমারের একটি ফোন নম্বরের সন্ধান পায়।
- কিষাণ কুমারের নম্বরটি ব্যবহার করছিলেন লন্ডন ফেরত তার বন্ধু সঞ্জীব চাওলা।
- সঞ্জীব চাওলার ফোন ট্যাপ করতে গিয়ে পুলিশ শুনতে পায়, সঞ্জীব ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে কিছু সংকেতে কথা বলছেন।
- একদিন হঠাৎ সেই ফোনে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক হান্সি ক্রোনিয়ের গলা শুনতে পায় পুলিশ।
- পুলিশ দেখতে পায়, ফোনে আগের দিন সঞ্জীব এবং ক্রোনিয়ে যা আলোচনা করছেন (যেমন কে টসে জিতবে, কে বল করবে), ঠিক পরের দিন ম্যাচে সেটাই ঘটছে।
সিরিজ শেষে পুলিশ সব প্রমাণ মিডিয়ার সামনে তুলে ধরে। শুরুতে অস্বীকার করলেও, পরে হান্সি ক্রোনিয়ে আদালতে স্বীকার করেন যে, তিনি বুকিদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন এবং দলের তথ্য পাচার করেছিলেন।
আজহারউদ্দিন, অজয় শর্মা এবং এমকে গুপ্তা
হান্সি ক্রোনিয়ের স্বীকারোক্তির পরই সিবিআই তদন্ত শুরু করে এবং ফিক্সিং জগতের এক বড় খেলোয়াড় এমকে গুপ্তা (মুকেশ গুপ্তা) পুলিশের জালে ধরা পড়েন। এমকে গুপ্তা ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মচারী থেকে বুকি বনে যাওয়া ব্যক্তি, যাকে আন্ডারওয়ার্ল্ড নতুন প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের দলে টানার দায়িত্ব দিয়েছিল।
- অজয় শর্মার উত্থান: ১৯৮৮ সালে এমকে গুপ্তা অজয় শর্মা নামক এক দরিদ্র কিন্তু প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে সাহায্য করতে শুরু করেন। ১৯৯০ সালে অজয় ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই এমকে গুপ্তাকে দলের ভেতরের খবর দিতে শুরু করেন।
- তাজ প্যালেস হোটেলে চুক্তি: অজয় শর্মার মাধ্যমেই তৎকালীন ভারতীয় অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের সাথে এমকে গুপ্তার পরিচয় হয়। সিবিআই রিপোর্ট অনুযায়ী, দিল্লির তাজ প্যালেস হোটেলে একটি চুক্তিতে আজহারউদ্দিন ম্যাচ ফিক্স করার জন্য ৫০ লক্ষ টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন।
- টাইটান কাপ এবং শচীন টেন্ডুলকার: এমকে গুপ্তার দাবি অনুযায়ী, একটি ম্যাচ হারার জন্য আজহারউদ্দিন কথা দিয়েছিলেন। পরিকল্পনা মতো আজহারউদ্দিন ও অজয় জাদেজা দ্রুত আউট হয়ে যান এবং মনোজ প্রভাকর ও নয়ন মোঙ্গিয়া ইচ্ছে করে ধীরগতিতে খেলতে থাকেন। কিন্তু একা শচীন টেন্ডুলকার সেই ম্যাচটি জিতিয়ে দেন। ম্যাচ শেষে শচীন ক্ষুব্ধ হয়ে ওই খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
প্রচুর প্রমাণ এবং ব্যাংক লকারের হিসাব সামনে আসার পর আজহারউদ্দিন সিবিআই-এর কাছে অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হন।
২০১৩ আইপিএল স্পট ফিক্সিং: শ্রীশান্ত এবং দাউদ ইব্রাহিম
২০০০ সালের পর বিসিসিআই খেলোয়াড়দের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বেশ কিছুদিন ফিক্সিং বন্ধ ছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে আইপিএল-এর মাধ্যমে বুকিরা আবারও ফিরে আসে।
- দিল্লি পুলিশ দাউদ ইব্রাহিম এবং ছোটা শাকিলের একটি কল ট্রেস করতে গিয়ে আবারও কাকতালীয়ভাবে আইপিএল ফিক্সিংয়ের সন্ধান পায়।
- ফোন রেকর্ডিংয়ে রাজস্থান রয়্যালসের খেলোয়াড় অজিত চান্ডিলা এবং শ্রীশান্তের নাম উঠে আসে।
- ফিক্সার জিজু জনার্দন শ্রীশান্তকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট ওভারে বেশি রান দেওয়ার আগে প্যান্টে তোয়ালে গুঁজে সিগন্যাল দিতে হবে। ম্যাচে ঠিক সেটাই ঘটে।
১৫ মে ২০১৩ তারিখে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দিল্লি পুলিশ মুম্বাইয়ের হোটেল থেকে শ্রীশান্ত, জিজু জনার্দন এবং অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করে। শ্রীশান্তের রুম থেকে ৭২ হাজার টাকা নগদ এবং একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। এই তদন্তে পরবর্তীতে বিসিসিআই সভাপতি এন. শ্রীনিবাসনের জামাতা গুরুনাথ মেয়াপ্পনের নামও জড়িয়ে পড়ে।
আইনি দুর্বলতা এবং উপসংহার
সিবিআই এবং পুলিশ বারবার এত বড় বড় ফিক্সিং চক্র ধরলেও, ভারতের আইনি দুর্বলতার কারণে এই অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৮৬৭ সালের পাবলিক অ্যাক্ট বা প্রতারণার মামলা দিয়ে ক্রীড়া দুর্নীতির বিচার করা কঠিন, কারণ এরা কেউ সরকারি কর্মচারী নন। ফলে আদালতে গিয়ে প্রমাণ হালকা হয়ে যায় এবং অভিযুক্তরা জামিন পেয়ে যান। দাউদ ইব্রাহিম থেকে শুরু করে পাড়ার পানওয়ালা—এই বিশাল বুকি নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। দশম শ্রেণীর একজন ছাত্রও হয়তো জানে কীভাবে বাজি ধরতে হয়, কিন্তু শক্তিশালী আইনের অভাবে প্রশাসন আজও এই অপরাধের শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পারেনি।


