মাশরাফির যেভাবে নিভৃতে বিদায় নিতে হলো

ক্রিকেটে কিংবদন্তিদের বিদায়বেলা সাধারণত হয় আবেগঘন। হাজারো দর্শকের করতালি, সতীর্থদের গার্ড অফ অনার এবং কাঁধে চড়ে মাঠ প্রদক্ষিণ—এভাবেই তো শেষ হয় এক একটি মহাকাব্য। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মহাকাব্যের রচয়িতা মাশরাফি বিন মর্তুজার ক্ষেত্রে গল্পটা একদম ভিন্ন।
যিনি খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে বাংলাদেশ দলকে বিশ্বমঞ্চে এক পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন, সেই ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’-এর বিদায়টা হয়েছে একদম নীরবে, নিভৃতে। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়, মিরপুরের ভরা গ্যালারির গর্জন নয়; সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যেতে হয়েছে এই কিংবদন্তিকে। কীভাবে এবং কেন এমন হলো? চলুন ফিরে তাকাই মাশরাফির সেই আক্ষেপের অধ্যায়ে।
৬ মার্চ, ২০২০। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডে। ম্যাচের আগেই মাশরাফি জানিয়ে দিয়েছিলেন, অধিনায়ক হিসেবে এটাই হতে যাচ্ছে তার শেষ ম্যাচ। সেই ম্যাচে দল জিতেছিল, সতীর্থরা তাকে কাঁধে তুলে মাঠও প্রদক্ষিণ করেছিলেন। কিন্তু মাশরাফি বারবার বলেছিলেন, “আমি শুধু অধিনায়কত্ব ছাড়ছি, খেলা নয়।” তার ফিটনেস, বোলিং এবং শেষদিকে নেমে ঝড়ো ব্যাটিং—সবকিছুই তখনও দলের জন্য কার্যকর ছিল। ভক্তরা ভেবেছিলেন, অন্তত খেলোয়াড় হিসেবে আরও কিছুদিন তাকে লাল-সবুজ জার্সিতে দেখা যাবে এবং একদিন মিরপুরে রাজকীয়ভাবেই তিনি বিদায় নেবেন।
কিন্তু সিলেটের সেই ম্যাচটির পরই বিশ্বজুড়ে হানা দেয় কোভিড-১৯ মহামারি। থমকে যায় ক্রিকেট। এরপর যখন ক্রিকেট ফিরল, তখন ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করল দৃশ্যপট। মহামারি পরবর্তী সময়ে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার যুক্তিতে মাশরাফিকে ওয়ানডে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়। বোর্ডের সাথে এক অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হয়। দেশের সফলতম অধিনায়কের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা বা সম্মানজনক বিদায়ের উদ্যোগ দেখা যায়নি। মাশরাফি বারবার ঘরোয়া লিগে নিজেকে প্রমাণ করলেও, জাতীয় দলের দরজা তার জন্য আর খোলেনি। কোনো বিদায়ী ম্যাচ ছাড়াই, নীরবে-নিভৃতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দৃশ্যপট থেকে মুছে যায় ১৭ বছরের এক সোনালী অধ্যায়।
শচীন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে কুমার সাঙ্গাকারা কিংবা ব্রেন্ডন ম্যাককালাম—বিশ্ব ক্রিকেটের সব কিংবদন্তিই পেয়েছেন তাদের প্রাপ্য বিদায় সংবর্ধনা। কিন্তু মাশরাফি? যিনি নিজের ক্যারিয়ারের চেয়ে দেশের জার্সিকে বেশি ভালোবেসেছেন, ৭ বার দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করার পরও অদম্য মানসিকতায় মাঠে ফিরেছেন, সেই মানুষটিকে বিদায় নিতে হলো মাঠের বাইরে থেকে। একটি আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচ হয়তো তার প্রাপ্য ছিল, যেখানে মিরপুরের গ্যালারিতে লাল-সবুজ পতাকা হাতে দর্শকরা শেষবারের মতো বলে উঠত— “থ্যাঙ্ক ইউ, ক্যাপ্টেন!”
ক্রিকেট ইতিহাসে মাশরাফি কেবল একজন পেসার বা অধিনায়ক নন; তিনি একটি আবেগ, একটি অনুপ্রেরণার নাম। আনুষ্ঠানিক কোনো বিদায় হয়তো তিনি পাননি, তার নামের পাশে লেখা হয়নি কোনো ‘ফেয়ারওয়েল ম্যাচ’-এর পরিসংখ্যান। কিন্তু তাতে মাশরাফির মহত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। বিদায়বেলার এই নীরবতা ক্রিকেট বোর্ডের ব্যর্থতা হতে পারে, কিন্তু কোটি বাঙালির হৃদয়ে মাশরাফি আজীবন সেই ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ হয়েই থাকবেন।
ট্যাগস: #MashrafeBinMortaza #CaptainMashrafe #BangladeshCricket #FarewellMatch #CricketLegend #SportsBlog #BDCricket



